Home » ৭০০ পাহাড়ের দেশে – কিরিবুরু এবং মেঘাহাতুবুরু

৭০০ পাহাড়ের দেশে – কিরিবুরু এবং মেঘাহাতুবুরু

Share this in your social media

৭০০ পাহাড়ের দেশে

১:

বারবিল জন শতাব্দী যখন চাইবাসা স্টেশনে পৌঁছলো তখন প্রায় ১১.৪০। একে তো আধা ঘন্টা লেট তারওপর অঝোরে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। ভারাক্রান্ত আকাশের সাথে আমার মন টাও ভারাক্রান্ত যথারীতি। গুগল ঘেঁটে metereological ডিপার্টমেন্টের থেকেও এই নিম্নচাপের সম্বন্ধে কোনো আশা ব্যঞ্জক কিছু খবর খুঁজে পেলাম না।

মোবাইলের নেট টা অফ করে দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শুধু নিজেকে একটাই ভরসা দিচ্ছি, নিজের ইচ্ছাশক্তির। হ্যাঁ। আমার অনেক ভ্রমণেই এইটার প্রমান পেয়েছি। অতি প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও অন্তত একটি দিন আকাশ পরিষ্কার পেয়ে গেছি। SMS এর আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দেখি Bolero গাড়ির নং টা পাঠিয়ে দিয়েছেন SAIL এর এক অফিসার,  যেটা বড়া জামদা স্টেশনে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।

২:

প্রায় ১.৩০ টা নাগাদ বড়া জামদা স্টেশন থেকে বেরিয়েই দেখি Bolero ড্রাইভার সমেত আমার জন্য অপেক্ষা করছে। বৃষ্টির তখনও থামার কোনো নাম নেই। ড্রাইভার অজিত আমায় নিয়ে রওনা দিলো মেঘাহাতুবুরুর উদ্দ্যেশে। পাশের গাড়িগুলোর চাকা থেকে ছিটকে আসা লাল মাটির কাদা জল উইন্ড স্ক্রিন থেকে wiper দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে অজিত পাহাড়ী রাস্তা ধরলো। আশপাশের দৃশ্যাবলী এবং আবহাওয়া, দুইয়েরই দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে ঘন কুয়াশা আর মেঘের আচ্ছাদন। এখন খেয়াল করলাম অজিতের পরনে সোয়েটার। জিজ্ঞেস করায় বললো, দুদিন লাগাতার বৃষ্টি হওয়াতে সকালের দিকে বেশ ঠান্ডা। কিরিবুরু মেঘাহাতুবুরুতে নাকি গ্রীষ্ম কাল বলে কিছু নেই, হয় বর্ষা নতুবা ঠান্ডা। পাহাড়টাকে পাক খেয়ে খেয়ে যত ওপরে উঠছি সামনের রাস্তার আর আশপাশের visibility ততটাই কমছে মেঘের দাপটে। ১০ ফুট দূরত্বে কিছু দেখা যাচ্ছে না। এ যেন ঠিক তিস্তা বিহীন উত্তরবঙ্গের কোনো এক পাহাড়ে ওঠার রাস্তা। গাড়ি গিয়ে সোজা থামলো একেবারে মেঘাহাতুবুরুর মেঘলয়া গেস্ট হাউসে Meghahatuburu Meghalaya Guest House।

৩:

আমার এক বন্ধুর বাবা SAIL এর উচ্ছপদস্থ অফিসার হওয়াতে Guest House এর বুকিং, সারান্ডা ফরেস্টে ঢোকার পারমিশন এবং গাড়ির ব্যবস্থা…সবই কোলকাতা থেকে করে রাখতে পেরেছিলাম। দোতলার একটি সুন্দর ঘর আমার জন্য রেডি করাই ছিলো। খিদের চোটে, রুমে চেকইন করেই নিচে ডাইনিং হলে চলে এসে বললাম খাবার রেডি করতে। বৃষ্টি কিছুটা কমলেও আকাশের অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। ডাইনিং হলের লাগোয়া কলাপ্সিবল গেট টার সামনেই লাল টাইলসে বাঁধানো লন। লনের ওপাশে একটি লোহার গেট। এই গেট দিয়ে বেরিয়েই সামনেই সানসেট পয়েন্ট।

যারা গেস্ট হাউসে থাকবেন না, তাঁরা বাইরে দিয়েও এই সানসেট পয়েন্টে আসতে পারেন। লজের লাগোয়া দুপাশের বড় বড় গাছগুলোর ফাঁক ফোকরে তখন মেঘের আনাগোনা আর আবছা আলো এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরী করেছে পাহাড়ে।

খেয়েদেয়ে ছাতাটা মাথায় দিয়েই ক্যামেরা নিয়ে চলে এলাম সানসেট পয়েন্টে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। সামনে মেঘ ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান নয়। সুর্যাস্ত দেখতে পাবার সম্ভাবনা নেই আজ ঠিকই, তবে মেঘের দেশ, মেঘাহাতুবুরুর এই আলো আঁধারিতে ডুবে থাকা দেখতে বেশ লাগছে।

পরেরদিন সকাল আটটায় যাতে গাড়ি নিয়ে বেরোতে পারি সেই ব্যবস্থা করে ওপরে রুমে চলে এলাম। ততক্ষনে থলকোবাদ যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ফরেস্ট অফিসারের পারমিট আমার হাতে এসে পৌঁছেছে ( আধার কার্ড ক্যারি করা বাধ্যতামূলক )। আজকের মত সব কাজ শেষ। এসি রুম হলেও এসি বা ফ্যান কোনোটারই প্রয়োজন হলো না রাত্রে। উল্টে কম্বল গায়ে দিয়ে শুতে হলো।

৪:

সকাল ছটায় উঠে জানালার বাইরে তাকাতেই, বুকের ওপর কাল থেকে চেপে থাকা পাথরটা এক ঝটকায় কে যেন সরিয়ে দিলো। পরিষ্কার ঝলমলে আকাশ। দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই গতকাল পবন দেব কি তান্ডবটাই না করে গেছেন। ঝটপট তৈরী হয়ে নিচে চলে এলাম একেবারে সানসেট পয়েন্টে। অবাক হতে হয় প্রকৃতির এই বিচিত্র মায়া দেখে। গতকালের ঘন সাদা মেঘ ও কুয়াশার পর্দা সরিয়ে আমার সামনে এখন উন্মুক্ত ৭০০ পাহাড়ের দেশ।

এই হলো সারান্ডা। যেমন তার ব্যাপ্তি, তেমনই তার মায়াবী মন ভোলানো রূপ। সকালের মিঠে আলোয় ঝকমক করছে একের পর এক পাহাড় আমার সামনে। যেন একের পর এক সমুদ্রের ঢেউ উথাল পাথাল করে চলেছে সমস্ত বিশ্ব চরাচর। “৭০০ পাহাড়” নামটির যথার্থতা হয়তো এই কারণেই।

সামনের পাহাড়গুলোর সবুজ বনাঞ্চল যেন একটু একটু করে রং পরিবর্তন করতে করতে দূরে নীল থেকে গভীর নীল হয়ে গিয়ে আকাশের সাথে মিশে গেছে। যতদূর চোখ যায়, শুধুই ঢেউ খেলানো পাহাড়ের চূড়া গুলো একের পর এক। লিখে বোঝানোর মত ভাষা আমার শব্দকোষে নেই।

আমি যদিও ৮.০০ র  মধ্যেই ব্রেকফাস্ট সেরে তৈরী, গাড়ি এলো ৮.৩০ টার পরে। ড্রাইভার জুম্মন মন্ডল স্থানীয় গ্রামের বাসিন্দা, অল্প বয়স। স্থানীয় ছেলে বলে সব রাস্তাই নাকি তার নখদর্পনে, এমনটাই আশ্বাস দিলো লজের এক কর্মচারী। কোন কোন জায়গায় যাবো সেগুলো আমি আগেই লিখে রেখেছিলাম। জুম্মনকে সেগুলো বলাতে মনে হলো সবই চেনে। আর সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম।

৫:

জুম্মন প্রথমেই নিয়ে এলো আমাকে কিরিবুরু হিল টপের  সান রাইস ভিউ পয়েন্টে। সারান্ডার ভিউ এখান থেকেও চমৎকার।

কিরিবুরু এবং মেঘহাতুবুরু দুটি যমজ পাহাড় গায়ে গা লাগানো। Sail এর আইরন ওর মাইনস দুটি জায়গাতেই আছে এবং দুটি জায়গাতেই আলাদাভাবে নিজস্ব মাইন এর কর্মচারীদের জন্য টাউনশিপ করা আছে। কখন আপনি কিরিবুরুতে আর কখন আপনি মেঘাহাতুবুরুতে তা কেউ বলে না দিলে বোঝা মুস্কিল।

জুম্মনের পরিকল্পনা মাফিক আমরা চলে এলাম কিরিবুরু মাইনস এর গেটে। জুম্মনের পারদর্শিতা আর দূরদর্শিতা নিয়ে প্রথম খটকাটা আমার লাগলো এই গেটেই যখন সিকিউরিটি কোনোভাবেই আমাদের ঢুকতে দিলো না। অগত্যা ফোন লাগালাম মেঘাহাতুবুরুর সেই অফিসারকে যার তত্ত্বাবধানে এসেছি। ফোনটা ধরিয়ে দিলাম জুম্মনের কানে। গাড়ি ঘুরিয়ে আমরা এইবার সোজা চলে এলাম মেঘাহাতুবুরু মাইনস এর গেটের মুখে। সেখানেও সিকিউরিটি। তবে এইবার Sail এর অফিসার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের এন্ট্রি করিয়ে দিলেন। কিছুটা এগিয়েই চোখে পড়লো লালচে পাথরের আইরন ওর মাইনস। দূর থেকে মাইনস এর কিছু ছবি নিয়ে এগোলাম থলকোবাদ এর পথে।

৬:

প্রায় ২৫ কিমি রাস্তা থলকোবাদ। পাহাড়ি রাস্তা পাক খেয়ে খেয়ে এগোতে থাকলাম। দুপাশে শাল পিয়ালের ঘন জঙ্গল। আগের দিন বৃষ্টি হওয়াতে সবুজটা আজ যেন আরো গাঢ়। জঙ্গলের ঘনত্ব কোনো কোনো জায়গায় এতটাই বেশি যে সূর্যের আলো পৌঁছচ্ছেনা। মাঝে মধ্যেই একটি নাম না জানা জলাধার জঙ্গলের ভেতর দিয়েই আমাদের গাড়ির পাশাপাশি বয়ে চলেছে কোথায় যেন।

আমরা এখন সারান্ডার গভীরে। দিনের বেলাতেও এখানে ঝিঁঝির ডাক স্পষ্ট। কয়েক বছর আগেও এই জঙ্গলে মাওবাদীদের উৎপাত ছিল। তবে এখন দু দুটো CRPF ক্যাম্প বসে যাওয়াতে যথেষ্ট শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। এই জঙ্গলে আগে হাতি, লেওপার্ড, চিতা, বুনো শুয়োর সবই ছিল। তবে ইদানীং মাইনিং এর ব্লাস্টিং এর আওয়াজে তারা বহু দূরে সরে গেছে। মিনিট ২০ যাওয়ার পরেই পেলাম প্রথম CRPF ক্যাম্প। ওনারা ফরেস্টের পারমিট এবং ঠিকানাসহ পরিচয়পত্র ভালো করে দেখে তবেই গাড়ি ছাড়লেন। যত এগোচ্ছি, জঙ্গল ততই গভীর হচ্ছে।

হঠাৎ আমার বাঁ দিকে জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় যেন একটি প্যান্ট শার্ট পরা মানুষের অবয়ব দেখলাম। গাড়ি থামিয়ে কিছুটা পিছতে বললাম। নাঃ। ভুল দেখিনি। মানুষই বটে, তবে কাকতাড়ুয়া। তবে বড্ড জিবন্ত। হাওয়াতে আবার নিজে থেকেই এদিক ওদিক ঘুরছে ভদ্রলোক।

জুম্মন বললো ফসল গুলো বন্য জন্তুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই ব্যবস্থা। এগোতে থাকলাম। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছে গাছের ওপর বাঁধা মাচা। হাতি বা অন্য কোন জন্তু জানোয়ার আসছে কিনা, তা দেখার জন্য এই ব্যবস্থা। রাস্তার দুপাশে মাঝে মধ্যে চোখে পড়ছে দু একঘর আদিবাসী বসতি। এভাবেই ঘন্টা খানেক কেটে গেল। এসে পৌঁছলাম দ্বিতীয় CRPF ক্যাম্পে। এটাই থলকোবাদ। ক্যাম্পের ঠিক উল্টোদিকেই যে রাস্তাটি গেছে, তার কয়েক পা এগিয়েই ডান হাতে পেয়ে গেলাম Tholkobad FRH ( Forest Rest House).

কাছাকাছিই থাকা উচিত একটি পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ার এবং লেওপার্ড কেভ। মুস্কিল হলো, না জুম্মন না CRPF তার কোনো হদিস দিতে পারলো। জুম্মনের অজ্ঞতা জানার আমার আর কিছু বাকি রইলো না। গাড়ি নিয়ে কিছুটা পিছিয়ে এলাম। একটি স্কুল একটু আগে যাওয়ার সময় চোখে পড়েছিল। সেই স্কুলের পাশে কিছু আদিবাসী বসতিও আছে।

নেমে হো উপজাতির স্থানীয় কিছু লোকের সাথে কথা বলে ওয়াচ টাওয়ার এবং লেওপার্ড কেভ এর দিক নির্দেশ পেলাম। এগিয়ে চললাম সেদিকে। পাকা রাস্তা ছেড়ে এখন গাড়ি জঙ্গলের মধ্যে কাঁচা রাস্তায়। ভিজে লাল নরম মাটি দিয়ে এগোচ্ছি। হঠাৎ একটি গর্ত পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে জুম্মন ভাই গাড়িটিকে নরম মাটিতে একরকম গেঁথেই ফেললো। এক্সেলারেটর এ পুরো চাপ মেরেও সে গাড়ি আর নড়ে না।

গভীর জঙ্গলের মধ্যে জুম্মন ভাইয়ের কল্যানে আমরা এখন আটকে। ইতিমধ্যে কোথা থেকে যেন একটি আদিবাসী ছেলের আবির্ভাব হলো , বয়স ১৩-১৪ হবে। এরকম বিপাকে স্থানীয় কাউকে পেলে, মনে বেশ বল পাওয়া যায়। ছেলেটিও মনে হলো আমাদের হেল্প করতে প্রস্তুত। মনে একটু বল পেয়ে আমারও মাথা কাজ করতে শুরু করেছে। জুম্মনের দ্বারা এই ক্রাইসিস সামলে ওঠা সম্ভব নয় তা আমি হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছি। একটু সরোজমিনে তদন্ত করে জুম্মনকে বললাম বাঁদিকের পেছনের চাকার পেছন থেকে মাটি খুঁড়ে বের করতে, ওই চাকাটাই গেঁথে আছে। নিজে গিয়ে স্টিয়ারিং ধরলাম। ও কিছুটা মাটি কুপিয়ে সরাতেই ব্যাক গিয়ার্ এ ফুল এক্সেলারেটর চেপে গাড়িটা সেই গর্ত থেকে তুলতে অবশেষে সক্ষম হলাম। আর ঝুঁকি নেওয়া যায় না গাড়ি নিয়ে। বাকিটা পথ হেঁটে যাওয়াই মনস্থির করলাম। আদিবাসী ছেলেটিকে সঙ্গে নিলাম গাইড হিসেবে। সে তো স্বানন্দে রাজি। শুরু হলো আমাদের পদব্রজে অরণ্য অভিযান। পিচ্ছিল রাস্তা। খুব সতর্ক হয়ে পা ফেলতে হচ্ছে। দুপাশের ঘন জঙ্গলের জঙ্গলী লতাপাতা গুলো গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই ভর দুপুরেও কি নিস্তব্ধ এই অরণ্য। মিনিট কুড়ি হেঁটে পৌঁছে গেলাম সেই পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ার। লতায় পাতায় আষ্টে পৃষ্টে জড়ানো টাওয়ারটি দেখে মনে হচ্ছে যেন এই অরণ্যের একটি অকৃত্রিম অঙ্গ সেটি।

এরপর এগোতে থাকলাম লেওপার্ড কেভ এর দিকে। রাস্তা বলতে গেলে ওই টাওয়ার অবধিই শেষ। এরপর দু ফুটের জঙ্গল কেটে চলার পথ। আদিবাসী ছেলেটি সাথে না থাকলে ঘুনাক্ষরেও আমরা এই সরু রাস্তার সন্ধান পেতাম না। আরও মিনিট দশেক হেঁটে পৌঁছে গেলাম সেই গুহায়। থমকে গেলাম গুহার মুখে এসে। এক বিশালকায় মাকড়সা তার জাল বিছিয়ে গুহার মুখ অনেকটা আগলে রেখেছে।

এটি টরেন্টুলা কিনা আমার জানা নেই তবে রং দেখে এটিকে ঘাঁটানোর সাহস হলো না। পাশ কাটিয়ে গুহায় ঢুকলাম। নিচু এই গুহাটিকে দেখে সত্যিই মনে হয় বাঘের আস্তানা। নিজেকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এর এক সদস্য ভাবতে ভাবতে অবশেষে গাড়ির পথে পা বাড়ালাম। ছেলেটির থেকে টোয়বা ফলসের দিক নির্দেশ নিয়ে, ওকে আন্তরিক ভাবে বিদায় জানালাম। কি নিঃস্বার্থ ভাবে গড়ে ওঠা শৈশব ছেলেটির। এই গভীর অরণ্যের মাঝে ভগবানের দূতের মতনই তার আবির্ভাব আমাদের রক্ষার্থে।

৭:

ওয়াচ টাওয়ার এর খোঁজ করার সময়তেই গ্রামবাসীরা বলেছিল টোয়বা যেতে গেলে ট্র্যাক্টর লাগবে কারণ রাস্তা খুবই খারাপ। অন্য একটি রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে কয়েকটি আদিবাসী ঘরের সামনে এসে গাড়ি রাখা হলো।

ট্রাক্টরের খোঁজ করাতে এক গ্রামবাসী এগিয়ে এলেন। পরনে লুঙ্গি আর শার্ট আর উল্লেখযোগ্য হলো ওনার মস্ত বড় গোঁফ। এই গোঁফের জন্যই ওনার নাম মঙ্গল মুচ্ছু। Tholkobad FRH এর কেয়ারটেকার উনি। আশ্বাস দিলেন যে এখন রাস্তা ঠিকই আছে তাই আমারদের গাড়ি নিয়েই যাওয়া যাবে। একবার অনুরোধ করতেই উনিও আমাদের টোয়বা ভ্রমণের সঙ্গী হলেন। রাস্তা বড়ই সরু এবং সঙ্গীন।

আশপাশের ঝোপ ঝাড়ের ডালপালা গুলো মাঝেমাঝেই জানালার ভেতরে ঢুকে গায়ে ঘষা খাচ্ছে এবং অদ্ভুত এক জঙ্গলী গন্ধের উদ্ভব হচ্ছে। উচুঁ নিচু রাস্তায় নুড়ি পাথর থাকায় বেশ কিছু জায়গায় চাকা স্কিড করছে। কোথাও আবার রাস্তা ভেঙে সরু জলাধারের ওপর দিয়েই এগিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি।

মঙ্গলের কথায় জানলাম মে মাসে আমের সময় হাতিরা এইদিকে চলে আসে আমের লোভে, সেই সময় FRH এর খুব কাছাকাছি হাতি দেখা যায়। মহুয়ার লোভে ভালুক ও আসে মাঝে সাঝে। FRH এ ইলেকট্রিসিটি নেই। খাবার সমস্ত রেশন এবং ডিজেল ট্যুরিস্ট কেই নিয়ে আসতে হবে বসবাসের জন্য। ডিজেল টা লাগবে জেনারেটার এর জন্য। ১০ লিটার ডিজেলে এক দিন এবং এক রাত হয়ে যাবে। গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম টোয়বা ফলস।

ঘন জঙ্গলের মধ্যে পাথরের মাজখান থেকে প্রায় ৪০ ফুট ওপর থেকে নেমে আসছে এই ঝর্না। কাঁচের মত টলটলে জলে নিচের লাল মাটি আর পাথরগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অরণ্যের পরিবেশের সাথে মানানসই অসামান্য সৌন্দর্য টোয়বার। মুগ্ধ হয়ে বসে থাকলাম কিছুক্ষন পাথরের ওপরে।

সামনের উচুঁ পাথরের ওপর দিব্যি ক্যামেরাটা রেখে ট্রাইপড এর বিকল্পও পেয়ে গেলাম। মনে হয় যেন ঘন্টার পর ঘন্টা এই অনাবিল সৌন্দর্যে ডুবে থেকে কাটিয়ে দেওয়া যায়, উঠতেই ইচ্ছে করছে না এই জায়গা ছেড়ে। বেলা গড়িয়ে এদিকে প্রায় ৩.৩০। আজ সানসেট মিস করা যাবে না। অগত্যা উঠতেই হলো। ফেরার পথে মঙ্গোল মুচ্ছু কে তার জায়গায় নামালাম। সৌজন্যতার খাতিরে তাকে 100 টাকা দিতে গেলাম। হাসিমুখে হাত জোড় করে উনি বললেন যে এই টাকা উনি নিতে পারবেন না, উনি তো কেয়ারটেকার এর চাকরি করেন। এনারা কি মানুষ? ভাবতেও অবাক লাগে। গায়ে কাঁটা দেয় এই সহজ সরল মানুষ গুলোর জীবন যাপন, সরলতা আর সততা দেখে। এত দারিদ্রের মধ্যেও মুখে লেগে আছে এক প্রশান্ত হাসি আর বুকের ভেতর সযত্নে লালিত পালিত এক পরোপকারী মন। মঙ্গল মুচ্ছুকে বিদায় জানিয়ে অবশেষে আমরা গাড়ি বাড়ালাম গেস্ট হাউসের উদ্দেশ্যে।

৮:

মনটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। দারুন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে কাটলো সারাদিন। পড়ন্ত বেলায় বেশ কিছু মনের মতন ছবি তুলতে তুলতে পৌঁছে গেলাম কর্মাপদা গ্রামে। গ্রামের কর্মেস্বর মন্দির দর্শন করে গেস্ট হাউসের পথে রওনা দিলাম।

৪.৩০ টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম গেস্ট হাউসে। একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে চলে এলাম সানসেট পয়েন্টে।

সকালের সেই ঝলমলে ৭০০ পাহাড়ের দেশ এখন ধীরে ধীরে রং পাল্টাতে শুরু করেছে বিকেলের রক্তিম আভায়। কি অপরূপ সৌন্দর্য তার ! দূরের নীলচে পাহাড়ের ঢেউয়ের ফাঁকে ফাঁকে খেলা করে বেড়াচ্ছে এক স্বর্গীয় আলো।

আকাশে হালকা মেঘ থাকতে আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে তার রূপ। বাকরুদ্ধ হয়ে দেখতে থাকলাম সূর্যের সেই ৭০০ পাহাড়ের পেছনে হারিয়ে যাওয়াকে।

সাক্ষী হয়ে থাকলাম এক স্বপ্নের দেশের স্বপ্নের মুহূর্তের। সূর্যাস্তের পরেও সেই স্বপ্নের পাহাড়ের দেশের পেছন থেকে বেরিয়ে আসছে গাঢ় কমলা রশ্মি।

এই স্বপ্নপুরীর কোনো এক সম্মোহন শক্তিতে অন্ধকার হওয়া অব্দি ওখানেই আটকে পরে থাকলাম আমি। আকাশ এখন নিকশ কালো। সেই কালো ক্যানভাসে জোনাকির মত জ্বলজ্বল করছে শত সহস্র নক্ষত্র। একটু আগে যেখানে সূর্য পাটে গেছে, এখন সেখানেই একফালি চাঁদ কাস্তের আকারে তার স্বমহিমায় বিরাজমান।

মুখে চোখে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দেখি সন্ধ্যে গড়িয়ে তখন ৭.৩০ টা। গুটি গুটি পায়ে ফিরে এলাম নিজের রুমে। পরেরদিনের জন্য অন্য এক ড্রাইভার ঠিক করা হলো আমার জন্য। সকাল আটটায় বেরিয়ে যাবো ঠিক হলো।

৯:

সকালে উঠে একেবারে ব্যাগপত্র গুছিয়ে ব্রেকফাস্টের টেবিলে চলে এলাম। মাঝ বয়সী ড্রাইভার শর্মা জী যথাসময় এসে উপস্থিত।

কিছু কিছু লোক আছে যাদের সাথে কথা বলেই তাদের পারদর্শীতার ওপর ভরসা করা যায়। শর্মা জী এমনই একজন, তাই আজকের ভ্রমণ পরিকল্পনাটা ওনার ওপরেই ছেড়ে দিলাম। বড়া জামদা থেকে ফিরতি জন শতাব্দী  দুপুর ২.০৪ এ, উনি বললেন তার মধ্যেই লাঞ্চ সেরে আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দেবেন। মেঘাহাতুবুরু মাইনস ছুঁয়ে কিছুটা এগিয়ে আজ আর থলকোবাদ এর রাস্তা না ধরে, ডান দিকের একটি কাঁচা রাস্তা ধরলেন শর্মা জী। ঠান্ডা কমতে শুরু করায় বুঝলাম আমরা নিচের দিকে নামছি। পাহাড়ি রাস্তা এদিকটায় বড্ড এবড়ো খেবড়ো আর সরু। দুপাশের জঙ্গলও অনেকটা গভীর। পেল্লাই সেগুন গাছের পাতাগুলো আরও রহস্যময় করে তুলেছে পথটাকে।

একটা জায়গায় এসে শর্মা জী গাড়ি দাঁড় করলো। রাস্তার ঠিক পাশেই জংলা পাথর বেয়ে একটু ওপরে উঠলাম। কলকল করে বয়ে চলেছে পাডিনালা ঝোড়া। রাস্তা থেকে দেখে কেউ খুঁজেই পাবে না এই ঝোড়া। কাছেই আছে পাডিনালা  পাম্প স্টেশন এবং স্টোরেজ। এইখান থেকে জল সরবরাহ করা হয় ওপরে মাইনসে।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য, কুমডি ড্যাম পৌঁছতে লাগলো প্রায় আধ ঘন্টা। দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে লাল নদী। বাঁধের অন্যদিক দিয়ে এই লাল মাটি মিশ্রিত জল পরিশোধিত হয়ে টলটলে পরিষ্কার জল হয়ে বেরোচ্ছে। কুমডি ড্যাম এর জলও পাম্পের সাহায্যে সরবরাহ হচ্ছে মাইনসে। ছবির মত সৌন্দর্য চারিদিকে। শর্মা জী এরপর যা চমক দিলেন, সত্যি আমি তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

১০:

ওপরে ওঠে চলে এলাম আমরা মেঘাহাতুবুরু আইরন ওর মাইনসের সামনে। মাইনসের ভিউ পয়েন্টটি এর ঠিক ওপরের বাঁকে।

ভিউ পয়েন্টে না গিয়ে দেখি শর্মা জী গাড়ি নিয়ে বেমালুম মাইনসের ভেতরেই ঢুকে গেলেন, মুখে একটা বেশ দুষ্টু মিষ্টি হাসি। উনি বুঝেছেন এইটা আমার আশাতেও ছিল না। লাল কালো পাহাড় কেটে কেটে পাথর গুলো ডাঁই করা আছে একেক জায়গায়।

মাইনসের বাইরের সবুজ ঘন জঙ্গলে মোড়া পাহাড় থেকে এসে হঠাৎ করে এইজায়গাতে ঢুকে একেবারে অন্যরকম লাগছে। কোথাও বা লালচে, কোথাও কালচে, আবার কোথাও হলদেটে পাথর মুখ বের করে আছে পাহাড় গুলো থেকে । তিন চারটি স্তরে রাস্তা করা আছে যেটা নিচে গভীর অব্দি চলে গেছে।

ভারী ভারী সমস্ত গাড়ি…কোনটা পাহাড় কাটছে, কোনটা বোল্ডার গুলো নিয়ে কোথাও দৌড়ে চলে যাচ্ছে, আবার কোথাও কোনো এক ভারী মেশিন পাথর ভাঙার কাজে ব্যস্ত।

স্তূপীকৃত  লৌহ আকরিক সারি দিয়ে সাজানো চারিদিকে। গাড়িটা রাস্তার একপাশে রেখে আমি ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছি। একটি দৈত্বকায় গাড়ির ছবি তুলতে দেখে পেছন থেকে শর্মা জীর প্রশ্ন, ” আপ চারোগে ইস্কে উপর ? ” আহ্লাদে আটখানা হয়ে সম্মতি জানালাম।

এই দৈত্বকায় গাড়ি গুলোকে বলে Dumper. চাকার উচ্চতা প্রায় এক মানুষ সমান। শর্মা জীর কথানুসারে, একবারে ১২০ টি লরির মাল লোড করে নিতে পারে এই dumper. এই একেকটি গাড়ির দাম প্রায় ১৩ কোটি।  ড্রাইভার যেইখানে বসে, সেখান থেকে ৯ মিটার অব্দি কিছু দেখা যায়না নিচে। ওঠার জন্য ৯০ ডিগ্রী angle এ একটি লোহার মই আছে। সেটা বেয়ে বেয়ে উঠে পড়লাম।

ড্রাইভার এর পাশে বসে dumping এর একটি পুরো ট্রিপের প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকলাম। অত উচুঁ থেকে অসামান্য ভিউ চারিদিকের। এক অমূল্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম এই শর্মা জীর দৌলতে।
১১:
অনেক্ষন মাইনসে ঘুরে বেরিয়ে এসে আমরা কিরিবুরু মেঘাহাতুবুরু টাউনশিপ গুলো ভালো করে ঘুরলাম। ছবির মত সাজানো চারিদিক। কোথাও একফোঁটা ময়লা নেই রাস্তাঘাটে। টাউন শিপের একজায়গায় চোখে পড়লো বিরসা মুন্ডার একটি সুসজ্জিত মূর্তি।

পার্ক, শপিং কমপ্লেক্স, ফুটবল মাঠ, বাস্কেট বল মাঠ, আর্চারি গ্রাউন্ড…সবই আছে SAIL এর কর্মচারীদের সুবিধার্থে। অথচ সবই যেন পাহাড়ী ছন্দে ভীষণ ভাবে মানানসই। আর্চারি গ্রাউন্ডে খেলোয়াড়রা প্র্যাক্টিস করছে। শর্মা জী আমাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে কোচ কে অনুরোধ করায়, তিরন্দাজির অভিজ্ঞতাও হলো।

গেস্ট হাউসে ফিরে চেক আউট সেরে শর্মাজীর সাথেই স্টেশনের পথে পা বাড়ালাম। বড়া জামদা যাওয়ার পথে একটা জায়গায় কারো নদী পার করতে হয়। সেই ব্রিজের ওপর নেমে এবারের মত কিরিবুরু মেঘাহাতুবুরু কে শেষ বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম কোলকাতার পথে।

© Arijit Kar

0 0 votes
Article Rating

I am eager to know your views on this post. Please leave a reply

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments